জলময়ূর | Pheasant Tailed Jacana | Hydrophasianus chirurgus

2660
জলময়ূর | ছবি: ইন্টারনেট

ক’বছর আগে গেছি শ্রীমঙ্গল জেলার হাইল হাওরে। এর আগে হাইল হাওরের নাম শুনেছি। নাম শুনেছি জলময়ূরের, কিন্তু দেখা হয়নি। সে সুবাদে দুটো জিনিস দেখার সৌভাগ্য হলো। সেখানে খুব সুন্দর একটি জলচর পাখিকে বিচরণ করতে দেখেছি সেদিন। অন্য সব প্রজাতির পাখিও দেখেছি। সৌন্দর্যে কেউ কারো চেয়ে কম নয়। তবে বেশি নজর পড়েছে জলময়ূর পাখির ওপর। পাখিটিকে দেখে ভীষণ অভিভূত হয়েছি। ভেসে থাকা জলদামের ওপর দাঁড়িয়ে আছে সে। ঝিরঝিরে বাতাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ওর লম্বা লেজটা নড়ছে। প্রথম একে ভেবেছি ডাহুক জাতীয় কোনো পাখি। কিন্তু ওর লম্বা লেজ দেখে ভাবনাটা সঙ্গে সঙ্গে উধাও হয়ে গেল। পরে খোঁজ নিয়ে জেনেছি, এরা ডাহুক গোত্রের নয়।

এ পাখির বাংলা নাম: ‘জলময়ূর’, ইংরেজি নাম: ফিজান্ট টেইল্ড জাকানা, (Pheasant-tailed jacana) বৈজ্ঞানিক নাম: হাইড্রোফাজিয়ানাস চিরারগাস, (Hydrophasianus Chirurgus) গোত্রের নাম: ‘জাকানাদি’।

পাখিগুলো লম্বায় লেজসহ ৪০-৫৮ সেন্টিমিটার হয় (লেজ ২৫ সেন্টিমিটার)। মাথা ও গলা সাদা। ঘাড়টা রেশমি সোনালি হলুদ। পিঠ চকলেট পাটকিলে। ডানার পাশটা ধবধবে সাদা। দেহের তুলনায় লেজ বেশ লম্বা। কাস্তের মতো বাঁকানো। পেটের নিচটা কালচে। এরা শীত মৌসুমে রঙ বদলায়। চকলেট পাটকিল থেকে ফিকে পাটকিলে বর্ণ ধারণ করে এবং বুকের ওপরে ‘ভি’ আকৃতির কালো নেকলেসের মতো দেখা যায়। শীতে এর আরো কিছু পরিবর্তন নজরে পড়ে। যেমন প্রজনন ঋতুতে এদের লেজটা থাকে লম্বা, কিন্তু এ সময় লেজটা তুলনামূলকভাবে খাটো দেখায়। স্ত্রী-পুরুষ পাখি দেখতে একই রকম; পার্থক্য শুধু আকারে। স্ত্রী পাখি পুরুষের তুলনায় খানিকটা বড়।

জলময়ূরের প্রধান খাবার শস্যদানা, জলজ ফল ও কীটপতঙ্গ। সাধারণত এদের বিচরণ জলাশয়ে। এরা ডাঙ্গায় কম বিচরণ করে। দেশের বড় বড় বিল-ঝিল কিংবা হাওর-বাঁওড়ের বাসিন্দা এরা। একসময় আমাদের দেশের ফরিদপুর, বিক্রমপুরসহ হাওরাঞ্চলে প্রচুর জলময়ূর দেখা যেত। এখন সে রকমটি আর দেখা যায় না। শিকারিদের অধিক দৌরাত্তেরে কারণে এ প্রজাতির পাখির সংখ্যা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে।

জলময়ূরের প্রজনন সময় জুন থেকে সেপ্টেম্বর। এ সময় এরা ‘মিই-ও-মিই-ও’ সুরে ডাকাডাকি করে। এদের যৌন জীবন অন্য পাখিদের চেয়ে একটু আলাদা। প্রজনন ঋৃতুতে জলময়ূরী হণ্যে হয়ে পুরুষ পাখিকে খুঁজতে থাকে। এ সময় অন্য জলময়ূরীর সঙ্গে যে কোনো জলময়ূরের ঘোরাফেরা করতে দেখলে প্রচণ্ড হিংসা হয় এদের। দুই ময়ূরীর মাঝে ঝগড়া বেঁধে যায়। পরিশেষে জিতে যাওয়া জলময়ূরীর সঙ্গে জলময়ূরের মিলন ঘটে। ঘর বাঁধার সপ্তাহ খানেক পরে জলে ভাসা লতাগুল্মের ওপর বাসা বানিয়ে জলময়ূরী ডিম পেড়ে পালিয়ে যায়। ওই এলাকা ত্যাগ করে ফের অন্য জলময়ূরের সঙ্গে ঘর বাঁধে। অর্থাৎ জলময়ূরীদের বহুগামিতা স্বভাব লক্ষ্য করা যায়।প্রজনন ঋতুতে একেকটি ময়ূরী ৭-৮ বার ঘর বাঁধে এবং ডিম দিতেও দেখা যায়। প্রতিবার ২-৪টি করে ডিম দেয়। ডিমে তা দেয়াও বাচ্চাদের দেখভালের দায়িত্ব পুরুষ পাখিকে নিতে হয়।

লেখক: আলম শাইন। কথাসাহিত্যিক, কলামলেখক, বন্যপ্রাণী বিশারদ ও পরিবেশবিদ।
সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক, 18/01/2019

মন্তব্য করুন:

Please enter your comment!
Please enter your name here

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.