লালশির ট্রগোন | Red headed Trogon | Harpactes erythrocephalus

1750
লালশির ট্রগোন | ছবি: ইন্টারনেট

পাখিটিকে আগে কখনও সরাসরি দেখিনি। ভিডিও ফুটেজে দেখেছি। তাতে কি আর সাধ মেটে! যদি সরাসরি না-ই দেখি তাহলে পাখি নিয়ে কিছু লেখা গপ্পো ছাড়া আর কী হতে পারে? কাজেই যেভাবে হোক ওকে আমার স্বচোখে দেখা চাই-ই চাই। হ্যাঁ, যে পাখিটির কথা লিখছি ওটার নাম ‘লালশির ট্রগোন’। পাখি দেখিয়ে এক বন্ধুর শরণাপন্ন হলে সে জানায়, পাখিটি নাকি সিলেটের মাধবকুণ্ডের ইকোপার্কে একবার দেখেছে। কথাটা জানতে পেরে আমার যেন তর সইছে না। ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে সময়-সুযোগ বুঝে ওই বন্ধুকে নিয়ে মাধবকুণ্ডে পৌছেছি। ওখানে পৌছে সঙ্গে সঙ্গে লালশির ট্রগোনের খোঁজে বেরিয়ে পড়ি। কিন্তু সাক্ষাৎ পাইনি। রাতটা কোনো রকম কাটিয়ে প্রত্যুষে ঘুম থেকে উঠে জঙ্গলের গভীরে প্রবেশ করেছি। সম্ভাব্য সব স্থানে খুঁজে হয়রানও হয়ে গেছি। তবুও সাক্ষাৎ মেলেনি।

বন্ধু পরামর্শ দিয়েছে জলপ্রপাতের লাগোয়া পাহাড়ের চূড়ায় চড়তে। না-সূচক জবাব দিয়েছি। সে সন্তুষ্ট হয়নি তাতে। তার মন রক্ষার্থে পরিশেষে চূড়ায় উঠতে বাধ্য হয়েছি। চূড়ার একপ্রান্তে বসে বাইনোকুলারটা চোখে ঠেসে ধরে এদিক-ওদিক ঘোরাচ্ছি। এভাবে মিনিট পাঁচ-সাতেক ব্যয় করেছি মাত্র। ঠিক এরই মধ্যে একটা বুনোগাছে গিয়ে আমার নজর ঠেকেছে। লাল রঙের কী যেন একটা দেখতে পেয়েছি। হতচকিত হয়ে দৃষ্টিটা গভীরভাবে নিক্ষেপ করেছি সেদিকে। আরে পাখিই তো! কি পাখি ওটা? তবে কি এটাই ‘লালশির ট্রগোন’? বন্ধু নিশ্চিত করেছে ট্রগোন পাখি এটি। আমি খুশি । ভীষণ খুশি। মুহূর্তেই মুগ্ধ হয়ে গিয়েছি ওর রূপের ঝলকে এবং হতবাক হয়েছি রূপের বাহার দেখে। স্বাভাবিক প্রশ্ন মাথায় জেগেছে, প্রকৃতি কি তবে নিজ হাতে এদের বানিয়েছেন? চুপচাপ বসে আছে পাখিটি। আমি তাকিয়ে রয়েছি ওর দিকেই। প্রতিজ্ঞা করেছি পাখিটা উড়ে না যাওয়া পর্যন্ত তাকিয়ে থাকব। কিন্তু সে সময় বেশি পাইনি। পাখিটা নিমেষেই উধাও।

লালশির ট্রগোনের ইংরেজি নাম: ‘রেডহেডেড ট্রগোন’, (Red-headed Trogon)| বৈজ্ঞানিক নাম: ‘হারপ্যাকটেস এরিথ্রোকেফালাস’ (Harpactes erythrocephalus)| গোত্রের নাম: ‘ট্রগোনিদি’| বাংলায় কোনো নাম নেই। আমাদের দেশের পাখি গবেষকরা নাম দিয়েছেন ‘লালশির ট্রগোন’। নামটা জুতসই বলা যায়।

ওই নামেই পরিচিত এখন। এরা লম্বায় ৩৩-৩৬ সেন্টিমিটার। গায়ে লাল পালকের আধিক্য। বিশেষ করে মাথা, ঘাড় ও বুক পরিষ্কার লাল। দেহের নিম্নাংশ গোলাপি এবং পিঠ ও লেজের মাঝখানে পাটকেলে পালক। ডানার ওপর সাদা-কালো রেখা। লেজটা বেশ বাহারি। দেহের তুলনায় কিছুটা বড়। লেজের নিচের পালক সাদা-কালো খাঁজকাটা। বুকের ওপর দিয়ে মালার মতো সাদা লাইন। ঠোঁট বেগুনি নীল, পা হালকা বেগুনি। স্ত্রী পাখির চেহারায় সামান্য পার্থক্য রয়েছে। মাথা, বুক, ঘাড় থেকে লেজ পর্যন্ত কমলা-পাটকেলে। ডাকে কিউ-কিউ সুরে। খায় পোকামাকড়, ফলমূল। সিলেটের গহিন জঙ্গলে এদের বাস। ট্রগোন নির্জনতাপ্রিয়। ফলে একাই থাকে।

শুধু প্রজননের সময় হলে ঘর বাঁধে। গহিন অরণ্যে গাছের কোটরে দুই থেকে চারটি ডিম পাড়ে ট্রগোন। স্ত্রী-পুরুষ পালা করে ডিমে তা দেয়। ডিম ফুটতে সময় নেয় ২০-২২ দিন।

লেখক: আলম শাইন। কথাসাহিত্যিক, কলাম লেখক, বন্যপ্রাণী বিশারদ ও পরিবেশবিদ।
সূত্র: দৈনিক সমকাল, 04/05/2012

মন্তব্য করুন:

Please enter your comment!
Please enter your name here

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.