চাতক পাখি | Pied cucko | Clamator jacobinus

4867
চাতক পাখি | ছবি: ইন্টারনেট

গানের গলা এদের বড়ই মধুর। ‘পিউ, পি-পি-পিউ’ সুরে ডাকে। জাদু করা সেই সুর বিলিয়ে এরা স্থান করে নিয়েছে মানুষের মনে, বাংলা সাহিত্যে ও গানে। এ দেশের খুব কম মানুষই আছেন, যারা এ পাখির নাম শোনেননি। তবে পাখিটি দেখেননি এ ধরনের মানুষের সংখ্যা তার চেয়েও অধিক। আমি নিজেও দেখিনি এতকাল। দেখেছি কেবল সেদিন। পাখি দেখতে বেরিয়েছি নিজ গ্রামে। সঙ্গে নিয়েছি একটি হাই রেজুলেশনের বাইনোকুলার।  সেদিন গাঁয়ের মেঠোপথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে একটা জঙ্গলে প্রবেশ করেছি। ভরদুপুর। গা ছমছম করছে। এ জঙ্গলে ক’বছর আগে এক স্কুলমাস্টার গলায় ফাঁস লাগিয়েছেন। আমি নিজেও তার লাশ দেখেছি। স্মৃতি রোমন্থন করে একটু ভড়কে গেছি। দ্রুত প্রস্থানের উদ্যোগ নিয়েছি। বেরুতে গিয়ে নজর ঠেকেছে একটা শিরিষ গাছের উঁচু ডালে। ওখানে একটি পাখি বসে এদিক-সেদিক ঘাড় ঘুরাচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে বাইনোকুলারের আইপিসে চোখ লাগিয়ে পর্যবেক্ষণে লেগে গেলাম।

বেশ সুন্দর পাখি। সাদা-কালো চেহারা। অন্য সব বর্ণের উপস্থিতি নেই। আগে কখনও অমন পাখি দেখেছি বলে মনে হয়নি। ডর-ভয় ভুলে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পাখিটাকে ভালোমতো দেখে নিলাম। যখন নিশ্চিত হলাম, এটি গায়ক পাখি চাতক, তখন একটা তৃপ্তি বোধ করলাম। যাক, পর্যাপ্ত না হলেও কিছু চাতক রয়েছে রায়পুরের (লক্ষ্মীপুর) চরপাতা গ্রামে। সেদিন চাতক দেখে আমি কিছুটা অনুপ্রাণিত বোধ করেছি পাখিদের কল্যাণে কিছু একটা করতে। পরিকল্পনা করেছি, পৈতৃক সম্পত্তিতে প্রকৃতির এ সন্তানদের জন্য ছোট্ট পরিসরে একটি অভয়াশ্রম গড়তে। যাতে ওরা নির্বিঘ্নে রাতে ঘুমাতে পারে।

চাতক পাখি নিয়ে চমৎকার একটি মিথও আছে। সেটি হচ্ছে,’মুমূর্ষু মা কিশোর ছেলের কাছে জলপান করতে চাইলেন। ছেলে মায়ের আকুতি ভুলে খেলায় মেতে রইল। ইতিমধ্যে মা পরপারে চলে গেছেন। ছেলে পড়েছে অনুশোচনায়। জল জল করে চেঁচিয়ে পাড়াময় ঘুরতে লাগল। এমনকি মাকে জল পৌঁছে দিতে ওপারে যেতে চাইল। অনেক দূরের পথ পাড়ি দিতে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করল পাখি বানিয়ে দিতে। সৃষ্টিকর্তা ওর আবেদনটা মঞ্জুর করলেন। হয়ে গেল সে পাখি। লোকের বিশ্বাস, ওই কিশোর আজও উড়ে উড়ে স্রষ্টার কাছে জল প্রার্থনা করছে।

এদের বাংলা নাম: ‘চাতক পাখি,| ইংরেজি নাম: ‘পায়েড কুক্কু’ (Pied cucko)| বৈজ্ঞানিক নাম: ‘ক্লামেটর জাকোবিনাস’ (Clamator jacobinus)। গোত্রের নাম: ‘কুকুলিদি’।

এ পাখি লম্বায় ৩৩-৩৫ সেন্টিমিটার। বর্ণ সাদা-কালো। ঝুঁটি, ঘাড়, পিঠ ও ডানা কালো। ডানার পাশটায় সামান্য সাদা ছোপ। গলা, বুক, পেট, লেজের নিচটা কালো। লেজের প্রান্ত সাদাটে। চক্ষু, পা কালো। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একই রকম। চেহারায় রাগী ভাব। তবে অত হিংস্র নয়। গ্রামাঞ্চলের মানুষ এদেরকে বড় বুলবুল পাখি বলে ভুল করে। এরা গাছের উঁচু ডালে অবস্থান করে। মাঝেমধ্যে মাটিতে নেমে আসে। মাটিতে হাঁটে লাফিয়ে লাফিয়ে। সমানতালে পা চালিয়ে হাঁটতে পারে না।

প্রধান খাবার: ঘাসফড়িং, শুয়োপোকা, পিঁপড়া, লতাগুল্মের কচিপাতা। প্রজনন সময় জুন থেকে আগস্ট। কোকিলের মতো পরের বাসায় ডিম পাড়ে। নিজেরা বাসা বাঁধতে জানে না। ডিমের সংখ্যা ১-২টি। ডিম ফুটতে সময় লাগে ১৮-২০ দিন।

লেখক: আলম শাইন। কথাসাহিত্যিক, কলামলেখক, বন্যপ্রাণী বিশারদ ও পরিবেশবিদ।
সূত্র: দৈনিক সমকাল, 31/08/2012

মন্তব্য করুন:

Please enter your comment!
Please enter your name here

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.