কালো বুলবুল | Black bulbul | Hypsipetes leucocephalus

1731
কালো বুলবুল | ছবি: ইন্টারনেট

মূলত এদের বাস সুন্দরবনের গভীরে। লোকালয়ে পারতপক্ষে ঘেঁষে না। সুন্দরবন অঞ্চলের আশপাশের গ্রামগুলোতে শীতকালে দেখা যায় মাঝে মধ্যে। দেশের সর্বত্র এ পাখির দেখা মেলে না খুব একটা। আমি প্রথম দেখেছি ১৯৯৫ সালে। সুন্দরবনের শাপলা রেঞ্জ চত্বর থেকে কিছুটা দূরে কেওড়াডালে বসে দুটি পাখি খুনসুটি করছে। কুচকুচে কালো পাখি দুটিকে দেখে কিছুটা হতবাক হয়েছি বৈকি।

কারণ আগেই জানতে পেরেছি, এরা বিরল প্রজাতির বুলবুল। তাই যত দ্রুত সম্ভব ট্রাভেল ব্যাগ থেকে বাইনোকুলারটা বের করলাম। মাত্র বাইনোকুলারের আইপিসে চোখ রেখেছি আর অমনি ওরা উড়ে গেল বনের ভেতর। আর দেখিনি সেদিন। দ্বিতীয় দফায় দেখেছি সুন্দরবন সংলগ্ন বরইতলা নামক গ্রামে। সেদিন অবশ্য খুঁটিয়ে দেখার সুযোগ হয়েছে।এ পাখি সম্পর্কে যতটুকু জেনেছি তা হচ্ছে, এরা খুব হিংস্র প্রকৃতির।

বুলবুলদের ভেতর এ প্রজাতিই বেশি হিংস্র। এদের আশপাশে অন্য কোনো পাখি সহজে ভিড়তে পারে না। সে যতবড় সেয়ান পাখিই হোক না কেন, ঠুকরে বিদায় করে। উপর্যুপরি আক্রমণ করে শত্রু পাখিদের নাস্তানাবুদ করে ছাড়ে। বিশেষ করে ডিমে তা দেওয়া অবস্থায় কিংবা বাসায় শাবক থাকার সময় শিকারি পাখি ত্রিসীমানায় প্রবেশ করতে পারে না।

আমাদের দেশে মোট পাঁচ ধরনের বুলবুল দেখা যায়। যথাক্রমে_ সিপাহি বুলবুল, লালপুচ্ছ বুলবুল, কালো বুলবুল, শাহ বুলবুল, কালো মাথা হলুদ বুলবুল। সব ধরনের বুলবুলই গায়ক পাখি। সে তুলনায় এরা ভালো গায়ক নয়, কণ্ঠস্বর মোটামুটি। সুন্দরবনের বনমোরগ এদের প্রিয় বন্ধু। বনমোরগের পায়ের নখের শক্ত আঁচড়ে মাটি থেকে পোকামাকড় বেরিয়ে এলে তা খায়। বিনিময়ে এরা বনমোরগের উপকারও করে। শত্রু দেখলে বনমোরগকে সতর্ক করে দেয়।

এ পাখির বাংলা নাম: ‘কালো বুলবুল’| ইংরেজি নাম: ব্ল্যাক বুলবুল’ (Black bulbul)| বৈজ্ঞানিক নাম: ‘Hypsipetes leucocephalus’| গোত্রের নাম; ‘পিকনোনোটিদি’।

কালো বুলবুল লম্বায় ২৪-২৫ সেন্টিমিটার। এদের মাথায় রয়েছে কালো ঝুঁটি। ঝুঁটিটা সামান্য উল্টোমুখী। কানের চারপাশে কুচকুচে কালো দাগ। এটি ঠোঁটের গোড়া থেকে শুরু হয়েছে। দাগটি পরখ করে না দেখলে বোঝা মুশকিল। কারণ ওদের শরীরের অধিকাংশ পালক কালো বিধায় এ বিশেষ কালো বর্ণটি খুঁজে পেতে কষ্ট হয়। তবে পাখি বিশারদদের বর্ণটি খুঁজে পেতে সমস্যা হয় না। কালো বুলবুলের শরীরের সব পালক কালো বর্ণের হলেও ডানার প্রান্ত থেকে লেজের প্রান্ত পর্যন্ত সাদাটে। ঠোঁট, পা লাল। স্ত্রী-পুরুষ পাখির মধ্যে তেমন কোনো তফাৎ নেই। শুধু ঝুঁটি ছাড়া, যা স্ত্রী পাখির নেই।

সব ধরনের বুলবুল সর্বভুক পাখি। পতঙ্গ থেকে শুরু করে ফলমূল সবই খায়। গৃহস্থবাড়ির আঙিনায় এলে ভাতও খায় এরা। প্রজনন সময় এপ্রিল থেকে জুন। বাসা বানায় পেয়ালা আকৃতির। মাটি থেকে সামান্য ওপরে গাছের তে-ডালায় বাসা বাঁধে। ডিম পাড়ে দুই থেকে চারটি। ডিমে তা দেয় স্ত্রী-পুরুষ মিলে। ডিম ফুটতে সময় লাগে ১৫-১৭ দিন।

লেখক: আলম শাইন। কথাসাহিত্যিক, কলামলেখক, বন্যপ্রাণী বিশারদ ও পরিবেশবিদ।
সূত্র: দৈনিক সমকাল, 29/09/2012

মন্তব্য করুন:

Please enter your comment!
Please enter your name here

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.