বিলুপ্তির পথে যেসব বন্যপ্রাণী

171
নীলগাই |  ছবি: ইন্টারনেট

তিন দশক আগেও আমাদের দেশে অসংখ্য বন্যপ্রাণীর সমাগম ছিল। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল ছিল বন্যপ্রাণীদের স্বর্গরাজ্য। সাঁঝের বেলায় শিয়ালের হাঁকডাক কিংবা বাগডাশার হুঙ্কারে কলজে কেঁপে উঠত সে সময়। আজকাল তেমন একটা শোনা যায় না ওসব। আগের মতো সে রকম বন্যপ্রাণীর আনাগোনাও নজরে পড়ছে না এখন আর। নানাবিধ কারণেই দেশ থেকে ওরা হারিয়ে যেতে বসেছে আজ। তন্মধ্যে প্রধান কারণগুলো হচ্ছে ১. বন্যপ্রাণীদের আবাসস্থল ধ্বংস করে দেওয়া। ২. অবাধে বৃক্ষনিধন (বিশেষ করে গাছের প্রাকৃতিক কোটরে যে সব পাখি বাসা বাঁধে তাদের প্রজননে বিঘ্ন ঘটছে ব্যাপক)। ৩. খাদ্য সংকট। ৪. জলাশয় ভরাট। ৫. পাখিদের বিচরণক্ষেত্র হাওর-বাঁওড়সহ অন্যান্য জলাশয়ে অতিরিক্ত মাছ শিকার। ৬. চরাঞ্চলে জেলেদের উৎপাতের ফলে মৎস্যভুক পাখিরা বিপাকে পড়ছে। ৭. বন্যপ্রাণী শিকার ও পাচারের ফলে আশঙ্কাজনক হারে এদের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। এ ছাড়াও দেশের সর্বত্রই হাট-বাজারে বিভিন্ন ধরনের পশু-পাখির মাংস প্রকাশ্যে বিক্রি করছেন কবিরাজ নামক এক ধরনের অপচিকিৎসকরা। তারা ধনেশ পাখি, বনরুই কিংবা শিয়ালের মাংস সামনে রেখে অশ্লীল ভাষায় ব্যক্ত করে বাত, ব্যথা এবং যৌন শক্তিবর্ধক ওষুধ বলে চালিয়ে দিচ্ছেন। সম্প্রাতিককালে চট্টগ্রামাঞ্চলের ‘টুট্টেং’ শিকার এই ধারাবাহিকতার ফল।

এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বন্যপ্রাণীদের বেশ ক’প্রজাতি আজ এ দেশ থেকে হারিয়ে গেছে। কিছু কিছু প্রজাতি রয়েছে বিপন্নের পথে। আবার কিছু প্রজাতি রয়েছে মহাবিপন্নের পথেও। (যে কোনো ধরনের প্রাণীর প্রজাতি যদি প্রকৃতি থেকে বছর দশেকের মধ্যে শতকরা ৫০ ভাগ বা তারও অধিক বিলুপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে সাধারণত সে প্রজাতি মহাবিপন্নের তালিকায় স্থান পায়) ‘নেচার কনজারভেশন কমিটি’তে কাজ করতে গিয়ে শিহরণ জাগানো কিছু তথ্য জানতে পেরেছি। সে তথ্যচিত্র দাখিল করলে পরিবেশ সচেতন মানুষ একটু হোঁচট খাবেন বোধ করছি।আমাদের ধারণা বিভিন্ন কারণে প্রকৃতি আমাদের ওপর নারাজ। ঝড়, জ্বলোচ্ছাস, বন্যা, খরা যেন আমাদের ললাটের সঙ্গী। এ জন্য আমরা আমাদের ভাগ্যটাকে দায়ী করছি এবং প্রকৃতির ওপর নাখোশও হচ্ছি। আসলে বিষয়টা যে মনুষ্যসৃষ্ট তা আমাদের অনেকেরই অজানা। অজানা রয়েছে নির্বিচারে বন্যপ্রাণী ও বন নিধন যে এরই সঙ্গে জড়িত সেই তথ্যটি।

লজ্জাবতী বানর |  ছবি: ইন্টারনেট

বিজ্ঞজনরা জানেন, সুন্দরবন আমাদের বিভিন্নভাবে বাঁচিয়ে রেখেছে। অনেকটা খাইয়ে-পরিয়ে বাঁচিয়ে রাখার মতো। সে মোতাবেক বলতে হয় সুন্দরবন আমাদের যেমন খাইয়ে রাখে তেমনি বুক পেতে আগলে রেখে ঝড়-ঝঞ্ঝা থেকেও রক্ষা করে। প্রমাণস্বরূপ বলতে হয় ‘সিডর’ নামক ঝড়ের কথা। ওই ঝড়ের তাণ্ডব থেকে অনেকাংশে সুন্দরবনই রক্ষা করেছে দেশের দক্ষিণাঞ্চলকে। (এ ছাড়াও জেলে, মৌয়াল, বাওয়ালি, কাঠুরে মিলিয়ে লাখ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষভাবে বনের ওপর নির্ভরশীল) অথচ সেই সুন্দরবন তছনছ করে দিতে আমাদের হাতে বিন্দুমাত্র কম্পন ধরেনি। কত অকৃতজ্ঞ হলে কাজটি করতে পারি আমরা তা কি কেউ ভেবে দেখেছেন?

বালিহাঁস | ছবি: ইন্টারনেট

সমীক্ষায় জানা যায়, সুন্দরবনের বাঘের অবস্থা বড়ই করুণ। বনজুড়ে মাত্র সাড়ে চারশর মতো রয়েল বেঙ্গল টাইগার রয়েছে। এত বিশাল আয়তনের জঙ্গলে এ কটি বাঘের বাস বেমানান নয় কি? দেশের পরিবেশবাদীরা জানিয়েছেন, সুন্দরবন অনেক আগেই ধ্বংস হয়ে যেত, যদি রয়েল বেঙ্গল টাইগার না থাকত। বলতে পারেন সেই ভয়ঙ্কর প্রাণীটার বদৌলতে চোরাই কাঠ কারবারীর চুরিতে বিঘ্ন ঘটছে বেশ খানিকটা। বিঘ্ন ঘটাচ্ছে বিষাক্ত সাপেও। চোরাই মৎস্য শিকারিকে পাহারা দিয়ে ঠেকিয়ে রেখেছে কুমির ও হাঙ্গর নামক অতন্দ্র প্রহরীরা। অথচ এই অতন্দ্র প্রহরী নিধনের মহোৎসব চলছে সুন্দরবনে। কেউ ভয় পেয়ে বন্যপ্রাণী পিটিয়ে নিধন করছে কেউবা নিধন করছে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে। এ ছাড়াও বিলাসিতা কিংবা রসনা বিলাসের শিকার হচ্ছে সুন্দরবনের চিত্রল হরিণগুলো। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ওই ফলটা খেয়ে দূর কোথাও গিয়ে মলত্যাগের মাধ্যমে বনায়ন সৃষ্টির ফলে অক্সিজেন ফ্যাক্টরি তৈরি করছে। আরও অবাক করা তথ্য হচ্ছে, হাওরাঞ্চলের মানুষের ধারণা অতিথি পাখিরা শুধু তাদের ফসল খেয়েই বিনষ্ট করছে। অথচ দেখুন সেই অতিথি পাখিরা হাওরেই প্রতিদিন একটন বিষ্ঠাত্যাগ করছে। যার ফলে ফসলের গাছ-গাছালি ও মাছ পাচ্ছে উপযুক্ত খাবার। সে উপকারী বন্ধু অতিথি পাখিসহ অন্যান্য পাখিনিধন করা আমাদের এখন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ওদের খাবারে বিষ মাখিয়ে, বিভিন্ন ধরনের ফাঁদ পেতে অতিথি পাখি শিকার করছি। কি জঘন্য কাজই না করছি আমরা! এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনার ফলে আজ দেশ থেকে অনেক প্রজাতির পাখি হারিয়ে গেছে পর্যন্ত। যেমন হারিয়েছে ফ্লোরিকান ময়ূর, পিংক মাথা হাঁস ও রাজ শকুন। আর হারিয়ে যেতে বসেছে ভাদিহাঁস, বালিহাঁস, দিগহাঁস, কালো তিতির, চন্দনা, বাংলা শকুনসহ নানা প্রজাতির পাখি। এ ছাড়াও আরও ১৯ প্রজাতির পাখি মহাবিপন্নের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে।

কালো তিতির | ছবি: ইন্টারনেট

প্রাণীদের মধ্যে মহাবিপন্নের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে ‘লজ্জাবতী বানর’। আমাদের দেশে বেশ ক’প্রজাতি প্রাণী আজ মহাবিপন্নের তালিকার রয়েছে। তন্মধ্যে লজ্জাবতী বানর অন্যতম। প্রাণীবিজ্ঞানীদের আশঙ্কা এটি দ্রুত হারিয়ে যাবে এ দেশ থেকে। যার ফলে লজ্জাবতী বানর ‘রেড সিগন্যালের’ আওতায় রয়েছে। এর অন্যতম কারণ অবাধে বনভূমি উজাড়। লজ্জাবতী বানরের বাসযোগ্য স্থান হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও লাউয়াছড়ার জঙ্গলে গভীর জঙ্গল। উঁচু গাছের মগডালে থাকতে পছন্দ করে এরা। জন-মানবের পদচিহ্ন নেই যেখানে, সেখানে ওদের বাস। অন্য কারণটি হচ্ছে এদের প্রজনন হারও সন্তোষজনক নয়। বছরে মাত্র একটি বাচ্চা প্রসব করে মাদী বানরটি। সন্তোষজনক নয় গড় আয়ুও। মাত্র ১০-১২ বছর বাঁচে, যদি অনুকূল পরিবেশ পেয়ে থাকে।

বন্যজন্তুদের করুণ পরিণতির কথা ব্যক্ত করলে আফসোস করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। কারণে অকারণে বলির পাঁঠা হচ্ছে জন্তু-জানোয়ারগুলো। হনুমানের অবস্থা আরও করুণ। লাউয়াছড়া, যশোরের কেশবপুরে কোনো রকমে বেঁচে আছে। হাতির অবস্থাও তেমন ভালো নয়। খাদ্যের অভাবে ওরা মিয়ানমার ও ভারতে পাড়ি জমাচ্ছে। আর যে প্রাণীটি এখন এ দেশে নজরেই পড়ছে না সেটি হচ্ছে নীলগাই। অথচ গত আড়াই দশক আগেও প্রাণীটি উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে চষে বেড়াত। শিকারিদের নিষ্ঠুরতার বলি হয়ে ওরা এখন আর আমাদের ধারে কাছেও ঘেঁষছে না। শুধু নীলগাই-ই নয়, দেখা যেত পদ্মার উচ্চ অববাহিকায় ঘড়িয়াল। নেই ওই প্রজাতির কেউ-ই এখন আর! ভবিষ্যতে আর দেখাও যাবে না। বিষয়টা ভাবতে কেমন লাগছে? কেমন লাগছে পরিবেশটা ভারসাম্য হারিয়ে পঙ্গু হতে দেখে? এ নিধন দ্রুত বন্ধ না হলে অদূর ভবিষ্যতে অন্ধকারের দিকে ঠেলে নিয়ে যাবে আমাদের আগামী প্রজন্মকে। তাই আমাদের উচিত প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে বন্যপ্রাণীদের ওপর যেন অত্যাচার-নিপীড়ন না ঘটে তার প্রতি সজাগ দৃষ্টি দেয়া। কাজটি কিন্তু ইচ্ছা করলেই করতে পারি আমরা।

চন্দনা টিয়া | ছবি: ইন্টারনেট

সরকার ইতিমধ্যে বন্যপ্রাণী রক্ষার্থে কিছু ভালো পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। তন্মধ্যে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন-২০১২ পাস হয়েছে। উক্ত আইনের ১নং ও ২নং তফসিলে ৬৫০ প্রজাতির পাখিকে প্রোটেক্টেড বার্ড (Protected Bird) হিসাবে অন্তর্ভুর্ক্ত করা হয়েছে। পরিযায়ী পাখি শিকারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা জরিমানার বিধান রেখেছে। সুন্দরবন ও টাঙ্গুয়ার হাওরকে Ramsar Site ঘোষণা করেছে। অপরদিকে টাঙ্গুয়ার হাওর, হাইল হাওর, হাকালুকি হাওর, নিঝুম দ্বীপ ও সোনাদিয়া দ্বীপকে Flayway Site ঘোষণা করেছে। এ সব এলাকায় বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত ‘স্ট্রেংদেনিং রিজিওনাল কো-অপারেশন ফর ওয়াইল্ড লাইফ প্রোটেকশন’ প্রকল্পের আওতায় বনবিভাগ-এনজিও-বিশ্ববিদ্যালয় যৌথভাবে কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। শকুনের মরণঘাতী ওষুধ ডাইক্লোফেনাক উৎপাদন নিষিদ্ধ করেছে সরকার। পাখিপ্রেমীদের উৎসাহিত করতে ‘বঙ্গবন্ধু অ্যাওয়ার্ড ফর ওয়াইল্ড লাইফ কনজারভেশন’ প্রদান করছেন। উদ্ধারকৃত ও আহত পাখির সেবাদানে সারা দেশে চারটি অঞ্চলে ‘বন্যপ্রাণী উদ্ধার কেন্দ্র’ স্থাপন করেছেন। পাখি সমৃদ্ধ এলাকা পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় Ecological Critical Area ঘোষণা করেছে।

এ ছাড়াও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন-২০১২তে উল্লেখ আছে বাঘ বা হাতি হত্যা করলে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা জরিমানা ও ৭ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। অন্যসব বন্যপ্রাণী শিকার করলে অথবা আইন লঙ্ঘনকারীকে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা জরিমানা এবং এক বছর কারাদণ্ডের কথা বলা আছে। আইনটি বাস্তবায়ন হলে অনেক বিপন্ন বন্যপ্রাণী রক্ষা পাবে। এ ক্ষেত্রে শুধু আইন পাস হলেই চলবে না, তার প্রয়োগও হতে হবে যথাযথ। না হলে আগামী দশকের মধ্যেই অনেক বন্যপ্রাণী বিলুপ্তির পথে পা বাড়াবে।

লেখক: আলম শাইন। কথা সাহিত্যিক, কলামিস্ট, গবেষক, বন্যপ্রাণী বিশারদ ও পরিবেশবিদ

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন, 17/10/2014

মন্তব্য করুন:

Please enter your comment!
Please enter your name here

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.