সাতভায়লা পাখি | Jungle babbler | Turdoides striata

1099
সাতভায়লা পাখি | ছবি: ইন্টারনেট

কথিত আছে, এক গেরস্থের সাত ছেলে ছিল। ছেলেদের বিয়ের উপযোগী বয়স হলে বাবা পাত্রীর সন্ধানে ঘটক লাগালেন। ঘটক পাশের গ্রামে বাসরত সুন্দরী এক পাত্রীর সন্ধান দিলেন। কনে দেখে সাত ভাইয়েরই পছন্দ হয়ে গেল। সাতভাই প্রত্যেকেই চায় ওই পাত্রীকে বউ করে ঘরে নিতে। এ নিয়ে ওদের মাঝে বিবাদও বাধে। বিষয়টা নিয়ে হট্টগোল সৃষ্টি হলে এবং তা চাউর হতেই ওই গ্রাম থেকে পালিয়ে যায় পাত্রী। পাত্রী নিখোঁজ হওয়ার সংবাদটা সাতভাইয়ের কানে গেলে পাগলের মতো হয়ে যায় তারা। ওরা সবাই মিলে পাত্রীকে খুঁজতে থাকে আশপাশের সব গ্রামে। খুঁজতে খুঁজতে এক সময় হয়রান হয়ে ওরা ওপরওয়ালার কাছে আবেদন জানায় পাখি বানিয়ে দিতে। যাতে উড়ে উড়ে তল্লাশি চালাতে পারে। সৃষ্টিকর্তা সাতভাইয়ের ফরিয়াদ কবুল করে ওদের পাখি বানিয়ে দেন। সেই থেকে ওরা পাখি হয়ে গ্রামগঞ্জের আনাচে-কানাচে বিচরণ করছে আজঅবধি। হাল আমলে এরা কাউকে না খুঁজলেও ওদের চলাফেরা দেখে এখনো সে রকমটিই মনে হয়। বিচরণের সময় এরা হঠাৎ প্রচণ্ড ঝগড়ায় মেতে ওঠে আবার নিমেষেই মিলেও যায়। এমন স্বভাবটি নাকি ওরা মানুষ থাকায় অবস্থায়ও ছিল।

উল্লেখ্য, এরা দলে শুধু সাতটিই নয় ১০-১৫টিও একত্রে থাকে। এ পাখির বড় গুণটি হচ্ছে এদের দলের কেউ বিপদে পড়লে এগিয়ে যায়। এ ছাড়া চমৎকার তথ্যটি হচ্ছে, এ পাখিদের মধ্যে কোনো জুড়ি যদি ডিম পাড়ে তাহলে অন্যরা গিয়েও সে ডিমে তা দেয়। শুধু তাই-ই নয় ডিম থেকে বাচ্চা ফুটলে সবাই মিলে ওদের খাইয়ে দেয় পর্যন্ত। এরা ডাকে ‘কিচ্-কিচ্ বা কিক-কিক’ সুরে। ভালো উড়তে পারে না। মাটিতে হাঁটে লাফিয়ে লাফিয়ে। কোকিল গোত্রীয় দুই-এক প্রজাতির পাখিরা এদের বাসায় ডিম পাড়ে।

এ পাখির বাংলা নাম: ‘সাতভায়লা’, ইংরেজি নাম: ‘জাঙ্গল ব্যাবলার’ (Jungle babbler), বৈজ্ঞানিক নাম: ‘টার্ডিডেস স্ট্রায়াটাস’(Turdoides striata) | গোত্রের নাম: ‘সিলভিআইদি’। সাতভাই নামেও এরা পরিচিত।

লম্বায় এরা ২৩-২৫ সেন্টিমিটার। গায়ের সমস্ত পালক মেটে বর্ণের। শরীরে কোনো রেখা নেই। তবে ওপরে নিচের অধিকাংশ পালকের মাঝ-দণ্ড ফ্যাকাসে বিধায় পালক দ্বি-রঙবিশিষ্ট মনে হয়। এদের চোখের বলয় সাদা। ঠোঁট মজবুত ও মোটা। বর্ণ হলুদ। পায়ের বর্ণও তদ্রƒপ হলদেটে। শরীরে তুলনায় লেজ খানিকটা লম্বা। স্ত্রী-পুরুষ পাখি দেখতে একই রকম।

সাতভায়লা পাখির প্রিয় খাবার ফুলের মধু ও খেজুরের রস। স্বাভাবিক খাবার কীটপতঙ্গ, কেঁচো, ছোট ব্যাঙ ইত্যাদি। প্রজনন সময় মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর। বাসা বাঁধে ঝোপজঙ্গলের ভেতর ছোট গাছের ডালে। বাসা বানাতে উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করে ঘাস-লতা। বাসাটা দেখতে পেয়ালার মতো। ডিমের সংখ্যা ৩-৪টি। ডিম ফুটতে সময় লাগে ১৪-১৬ দিন।

লেখক: আলম শাইন। কথাসাহিত্যিক, কলামলেখক, বন্যপ্রাণী বিশারদ ও পরিবেশবিদ।
সূত্র: দৈনিক মানবকণ্ঠ, 29/09/2013

মন্তব্য করুন:

Please enter your comment!
Please enter your name here

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.