Home / দৈনিক সমকাল / নীলাঞ্জনা পাখি

নীলাঞ্জনা পাখি

sk250512

অন্যসব কাজে আলসেমি করলেও পাখি দেখার ক্ষেত্রে কখনও অমনটি ঘটেনি। যত ব্যস্তই থাকি না কেন, বুনো পাখিদের খবর পেলে সেখানে ছুটে যেতে চেষ্টা করি। সুন্দরবন থেকে শুরু করে পার্বত্যাঞ্চলে বহুবার গিয়েছি দুর্লভ পাখির সন্ধানে। কখনও দেখেছি, কখনও না দেখে ফিরে এসেছি। এ নিয়ে আফসোস করিনি মোটেও। বরং পাখ-পাখালির দেখা না পেলে বন, বন্যপ্রাণীদের আবাস সংকট ও জলাশয়ের করুণ পরিণতি দেখে গৃহে ফিরি এবং নিজ বলয়ের মধ্যে থেকে যতটুকু সম্ভব প্রকৃতিকে বাঁচানোর আহ্বান জানাই। এতে কিছুটা হলেও কাজ হবে বলে আমাদের বিশ্বাস। সম্প্রতি টেকনাফ যাই বুনো হাতির দর্শনে। আসার সময় হরিখোলার জঙ্গলে ঢুঁ মেরেছি। কাছাকাছি একটি পাহাড়েও চড়েছি। উপরে উঠেই দেখতে পেয়েছি পাহাড়ের পূর্বদিকের বৃক্ষরাজিতে বসা একটি ধনেশ পাখির দিকে তাকিয়ে রয়েছে এক বিদেশি দম্পতি। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছি আমিও। ধনেশটা দেখে চলে আসার মুহূর্তেই নীলচে কালো বর্ণের একটি পাখি নজরে এলো। পাখিটির দিকে তাকাতেই আনন্দে বাকরুদ্ধ হয়ে যায় আমার। হ্যাঁ, এ পাখিটিই মনে মনে খুঁজেছি এতদিন। অপ্রত্যাশিতভাবে আজ এটি একেবারে চোখের সামনে হাজির। প্রবাদতুল্য বাক্যটি এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, ‘মেঘ না চাইতে বৃষ্টি’। সত্যি বলতে কি পাখিটিকে বহু বছর আগে একবার দেখেছি চাঁদপুরে, কিন্তু খুঁটিয়ে দেখার সুযোগ হয়নি তখন। এবার সে সুযোগটি হাতছাড়া করিনি।

পাখিটির ইংরেজি নাম: ‘ব্লু হুইসলিং থ্রাস’ (Blue whistling thrush), বৈজ্ঞানিক নাম: ‘মাইওফোনাস সারুলিয়াস’ (Myophonus caeruleus), গোত্রের নাম: ‘মুস্কিকাপিদি’। এ পাখিটির বাংলা আদি কোনো নাম নেই। আমাদের দেশের পাখি গবেষকরা নাম দিয়েছেন ‘নীলাঞ্জনা পাখি’।

নামটির ভেতর চমৎকার একটি সাহিত্যবোধ লুকিয়ে রয়েছে। পাখিটি লম্বায় ৮-১০ ইঞ্চি। আকৃতি শালিকের মতো। পিঠের পালক রূপালি নীলচের ওপর সাদা বুটির মতো কাজ করা। মাথাটা নীলচে কালো। ডানা ঝকঝকে নীল। কনীনিকা কালো, ঠোঁট হলুদ, পা ও আঙুল ছাই কালো। তুলনামূলকভাবে পা একটু লম্বা। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একই রকম।এগুলোর মূল বাসভূমি উত্তর বেলুচিস্তানের পাহাড়ি জঙ্গল থেকে শুরু করে উত্তর-পূর্ব অরুণাচল প্রদেশ পর্যন্ত। প্রচণ্ড শীতে এগুলো হিমালয়ের পাদদেশ থেকে আমাদের দেশে চলে আসে। এগুলোর প্রধান খাবার পোকামাকড়, যা এ অঞ্চলে প্রচুর পাওয়া যায়। ফলে এগুলো এ দেশেই বেশি সময় কাটিয়ে দেয়। শুধু প্রজননের সময় হিমালয় অঞ্চলে চলে যায়। প্রজননকাল এপ্রিল-জুন। এ সময় পুরুষ পাখিটি সকাল-সন্ধ্যা হুইসেলের মতো শব্দ করে স্ত্রী পাখির দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে। জুটি বাঁধার পর পাহাড়ি জলাধারের কাছাকাছি গাছের ডালে পেয়ালা আকৃতির বাসা বানায়। ডিম পাড়ে ২-৩টি। বাচ্চা ফুটতে সময় নেয় ১৮-২০ দিন। বাচ্চা স্বাবলম্বী হলে পুরুষ পাখিটি আলাদা হয়ে যায়। পরবর্তী প্রজনন মৌসুম পর্যন্ত একা একা বিচরণ করে। পরের বছর অন্য স্ত্রী নীলাঞ্জনার সঙ্গে সংসার পাতে। গান গেয়ে মজাতে পারলে সাবেক স্ত্রীর সঙ্গে ঘর বাঁধার অনুমতি মেলে।

লেখক: আলম শাইন। কথাসাহিত্যিক, কলাম লেখক, বন্যপ্রাণী বিশারদ ও পরিবেশবিদ।
সূত্র: দৈনিক সমকাল, 25/05/2012

আরো পড়ুন