নওরঙ

sk010612

খুব ছোটবেলায় প্রথম এ পাখি দেখি নিজ বাড়ির জঙ্গলে। সে সময়ের একটি করুণ দৃশ্য স্মৃতিতে গেঁথে রয়েছে অদ্যাবধি। পাখিটা আনারস পাতার ওপর বসে ছিল। পাশের ঝোপের ভেতর ছিল আমাদের পোষা বিড়ালটা। তা খেয়াল করেনি পাখিটা। চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই বিড়ালটা থাবা মেরে একটা ডানা কামড়ে ধরে। ওই অবস্থায়ই পাখিটাকে মুখে নিয়ে বিড়ালটা উধাও। আমি অসহায় দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে রয়েছি ওর দিকে। বিড়ালটাকে তাড়ানোর শক্তি তখন আমার ছিল না। ঘটনার পর থেকে আর দেখিনি এ প্রজাতির পাখি। বড় হয়ে অনেক খোঁজ নিয়েও ওদের অবস্থান নির্ণয় করতে সক্ষম হইনি। পাখি দেখিয়ের তালিকায় নিজেকে জড়িয়ে নেওয়ার পর এ প্রজাতির পাখি দেখার প্রয়োজনীয়তা বোধ করি। চষে বেড়াই বন-জঙ্গল। সন্ধান পেয়ে চলে যাই কালিয়াকৈর (গাজীপুর) শালবনে। অনেক সময় ধরে খোঁজাখুঁজির পর পেয়েও যাই। একেবারে হাতেনাতে ধরা পড়েছে গান গাওয়া অবস্থায়। এরা ভারি লাজুক পাখি। গলাটা মিষ্টি। গান শুনলে যে কারোরই ভালো লাগবে। হয়তো এমনও হতে পারে শ্রোতা ওদের গানে মজে গিয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করে দিয়েছেন। কিন্তু দেখা পাচ্ছেন না। হন্যে হয়ে খুঁজছেন, তারপরও বের করতে পারছে না ওর অবস্থান। কারণ এরা গাছের পাতার আড়ালে নিজেকে বন্দি করে রাখে কৌশলে।

এ পাখির বাংলা নাম অনেক। বর্ণালি, শুমচা, নীলপাখি ইত্যাদি। হিন্দি নাম নওরঙ। কোনো কোনো অঞ্চলে হালতি পাখি নামে পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গের পক্ষীবিশারদ ‘অজয় হোম’ হিন্দি নামটার বাংলা করেছেন ‘বর্ণালি’। তবে এ দেশে ‘নওরঙ’ নামে বেশি পরিচিত। নওরঙের ইংরেজি নাম: ‘ইন্ডিয়ান পিট্টা,(Indian pitta)’ বৈজ্ঞানিক নাম: ‘পিট্টা ব্রাকাইউরা'(Pitta brachyura) গোত্রের নাম: ‘পিট্টিদি’।

লম্বায় নওরঙ ২০-২১ সেন্টিমিটার। লেজ একেবারেই খাটো। প্রথম দেখাতে মনে হবে বুঝি ওদের লেজই নেই। খুব ভালো করে পরখ করলে লেজটা ধরা পড়বে। ওদের পালকে রয়েছে লাল, সাদা, কালো, হলুদ, নীল, সবুজ ও বাদামি রঙের সংমিশ্রণ। মাথার ওপরটা হলদেটে পট্টির মতো। গলার নিচটা সাদা। চোখের দু’পাশ মোটা দাগের কাজল কালির টান দেওয়া। দাগটি একেবারে ঘাড়ে এসে ঠেকেছে। চোখের ওপর রয়েছে সরু সাদা টানা দাগ। পিঠ, কাঁধ সবুজ। ঠোঁট কালো। ডানার শুরুটা নীল, নিচের অংশ বাদামি। বুকের তলার দিকে লালচে বাদামি। লেজের নিচের পালক টুকটুকে লাল। পা ফিকে বেগুনি।নওরঙ পাতাঝরা জঙ্গলের বাসিন্দা। মাটিতে বিচরণ করে সর্বদাই। মাটিতে পড়ে থাকা পাতা উল্টে-পাল্টে খাবারের সন্ধান করে। কেঁচো, পোকামাকড় প্রধান খাবার।মিষ্টি গলার নওরঙ শিস দেয় বেশ উচ্চস্বরে। ‘হুই হুইট-টিউ… টিউট টিউট টু…’ সুরে গান গায়। সুরে ছান্দসিক তাল আছে। পুরুষের তুলনায় স্ত্রী পাখি গানে বেশি পারদর্শী। গান গাওয়ার সময় মাথাটা ঘাড়ে ঠেকিয়ে আকাশমুখী হয়ে গান গায়। খুব বেশি উড়াল দিতে পারে না নওরঙ। থেমে থেমে ওড়ে।

প্রজনন মৌসুম আষাঢ় থেকে শ্রাবণ। নিচু গাছের ডালে বাসা বাঁধে। বাসা লম্বাটে ধাঁচের। ডিম পাড়ে ৪ থেকে ৬টি। ডিম ফুটতে সময় নেয় ১৪ থেকে ১৬ দিন। বাচ্চা উড়তে শেখে ২০ থেকে ২৫ দিনে। উড়তে শেখার আগেই বাচ্চারা মাটিতে নেমে মায়ের পেছন পেছন হাঁটাহাঁটি করে। সে মুহূর্তেই বাচ্চারা বিপদে পড়ে যায় বেশি।

লেখক: আলম শাইন। কথাসাহিত্যিক, কলাম লেখক, বন্যপ্রাণী বিশারদ ও পরিবেশবিদ।
সূত্র: দৈনিক সমকাল, 01/06/2012

আরো পড়ুন