Home / দৈনিক কালেরকণ্ঠ / কালাগলা মানিকজোড়

কালাগলা মানিকজোড়

kk191113

লাল রঙের লম্বা দুটি পায়ে মাছ শিকারের জন্য অল্প পানিতে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে ময়ূররঙা গলা ও লম্বা কালো চঞ্চুধারী কোনো সারস- এমন দৃশ্য দেখার জন্য সুন্দরবন ও আশপাশের জেলাগুলোতে হন্যে হয়ে ঘুরি। দেশের বিভিন্ন এলাকায় যোগাযোগ করে খোঁজ পাওয়ার জন্য উদ্গ্রীব থাকি। কিন্তু খবর মেলে না। ভাবি, বিরল দর্শন পরিযায়ী পাখিটি কি তবে দেশ থেকে হারিয়ে গেল!

কাঙ্ক্ষিত পাখিটির নাম কালাগলা মানিকজোড়। বেশির ভাগ সময় জোড়ায় জোড়ায় থাকে বলে এদের মানিকজোড় বলা হয়। তবে একাকীও বিচরণ করে। ইংরেজিতে ডাকা হয় ‘ব্ল্যাক নেকড স্টর্ক’ নামে। ইতিহাস বলে, উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়েও আমাদের দেশে এসব পাখির মোটামুটি বেশ বিচরণ ছিল। বিশেষ করে সুন্দরবন ও আশপাশ অঞ্চলের জলাভূমিতে দেখা যেত বেশি। এ ছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম বিভাগেও দেখা যেত তখন। তবে ওই সময়েও এরা বাংলাদেশে ভালো অবস্থানে ছিল না। গায়ের আকর্ষণীয় রঙের কারণে শিকারিদের শ্যেনদৃষ্টি বরাবরই ওদের পেছনে ঘুরঘুর করে। বলা যায়, দৈহিক সৌন্দর্যের কারণে পাখিটিকে নির্বিচারে শিকার করা হতো। তাই বিশ্বের লুপ্তপ্রায় পাখির তালিকায় ব্ল্যাক নেকড স্টর্কের নাম উঠে গেছে। হারিয়ে যেতে বসেছে কালাগলার মানিকজোড়।

পাখিটির বিস্তৃতি ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ইন্দোচীন, অস্ট্রেলিয়া থেকে নিউগিনি পর্যন্ত। বিশ্বে এ ধরনের ২৬ প্রজাতির পাখি রয়েছে। তার মধ্যে বাংলাদেশে আট প্রজাতির বিচরণ ছিল। কিন্তু নির্বিচার শিকারের কারণে বর্তমানে এশিয়ান শামুকখোল ও ছোট মদনটাক নামের দুটি প্রজাতির কিছু পাখি ছাড়া বাকিগুলো আর নজরে পড়ে না। শিকারিদের নৃশংসতার কারণেই মূলত বাদবাকিগুলো দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছে।

বছরখানেক আগে বিভিন্ন সূত্রে জানতে পারি, বাগেরহাটে এক জোড়া কালাগলা মানিকজোড়ের দেখা মিলত। কিন্তু শিকারির বন্দুকের গুলিতে এর একটি মারা পড়ে। সঙ্গী হারিয়ে ভয়ার্ত অন্য পাখিটি এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। সংবাদপত্রে সেই খবর ছাপা হয়। অথচ বছর দশেক আগে বাগেরহাটের বিলাঞ্চলে ওদের বেশ কিছু জোড়ের উপস্থিতি আমি নিজেই লক্ষ্য করেছি।

কালাগলা মানিকজোড়ের বৈজ্ঞানিক নাম Ephippiorhychus asiaticus। কাছের প্রজাতির নাম- কালা মানিকজোড়, ধলা মানিকজোড় ও ধলাগলা মানিকজোড়। পাখি বিশেষজ্ঞ ড. রেজা খানের ‘বাংলাদেশের পাখি’ গ্রন্থে এদের ‘লোহারজঙ্গ’ নামেও অভিহিত করা হয়েছে। এরা লম্বায় ১২৯ থেকে ১৫০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। এর মধ্যে ঠোঁট ৩১ সেন্টিমিটার, পা ৩২ সেন্টিমিটার আর লেজ ২৭ সেন্টিমিটার হয়ে থাকে। বাকিটা দেহ। প্রাপ্তবয়স্কদের মাথা, গলা, ঘাড়, ডানা ও লেজে নীলচে কালোর ওপর বাদামি রঙের মিশ্রণ থাকে। কাঁধ থেকে পিঠের মাঝ বরাবর এবং দেহের নিচের অংশ সাদা। ঠোঁট কালো, নিচের অংশ ওপরের দিকে বাঁকানো। লম্বা পা জোড়া প্রবাল লাল। স্ত্রী-পুরুষ পাখি দেখতে একই রকম। পার্থক্য শুধু চোখের বর্ণে। পুরুষের চোখের তারা বাদামি। অন্যদিকে স্ত্রী পাখির ক্ষেত্রে চোখের তারা হলুদ।

এদের প্রধান খাবার মাছ, ব্যাঙ, ইঁদুর, মৃত পাখি ও বিভিন্ন প্রজাতির সরীসৃপ। বাইন মাছের প্রতি এদের আসক্তি লক্ষ্য করা যায়।

এদের প্রজনন সময় সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর। বড় বড় গাছে চিকন ডালপালা ও লতাপাতা দিয়ে বাসা বাঁধে। ডিম পাড়ে তিন থেকে চারটি। ডিম ফুটতে সময় লাগে ২৭ থেকে ২৯ দিন।

লেখক: আলম শাইন। কথাসাহিত্যিক, কলাম লেখক, বন্যপ্রাণী বিশারদ ও পরিবেশবিদ।
সূত্র: কালেরকণ্ঠ, 19/11/2013

আরো পড়ুন