বন খঞ্জন | Forest Wagtail | Dendronanthus indicus

377

ছবি: গুগল |

বলতে দ্বিধা নেই, এক সময় আমি সৌখিন পাখি শিকারি ছিলাম। নেশাটা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে তখন। সেই ভূতটা মাথাচাড়া দিলে রাতের আঁধারেও শিকারে বের হতাম একেক সময়। গুলি করে পাখি শিকার করা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার ছিল তখন আমার জন্য। অনেকটা না বুঝেই কাজটি করেছি সে সময়। অতীত স্মৃতি মনে এলে অনুশোচনা বোধ করি এবং লজ্জিত হয়ে পড়ি এখন। সেই গর্হিত কাজের প্রায়শ্চিত্ত করার পরিকল্পনা করছি পাখিদের কল্যাণে অভয়াশ্রম গড়ার মধ্য দিয়ে। বিষয়টা জানতে পেরে মানবকণ্ঠ পত্রিকা কর্তৃপক্ষ আমাকে বিশেষভাবে উৎসাহিতও করেছে। তাদের উৎসাহে আমার উদ্যম বেড়ে গেছে দ্বিগুণ। পণ করেছি কাজটি আমি করবই। তবে অবশ্যই আমার কাম্য সব প্রকৃতিপ্রেমীদের সহযোগিতা।

যাই হোক, ওই বিষয়ে পরে বিস্তারিত জানানো হবে প্রকৃতিপ্রেমীদের। আজ পাখি নিয়ে কথা বলছি। প্রতিবারের মতো আজো একটি পাখির জীবন বৃত্তান্ত নিয়ে আলোচনায় যাচ্ছি। যে পাখিটার জীবন বৃত্তান্ত তুলে ধরছি আজ আপনাদের সামনে তার

বাংলা নাম: ‘বনখঞ্জন,’ ইংরেজি নাম: ‘ফরেস্ট ওয়াগটেল’(Forest Wagtail), বৈজ্ঞানিক নাম: Dendronanthus indicus |

এরা লম্বায় ১৬-১৮ সেন্টিমিটার। ঘাড়ের দুপাশ জলপাই রঙা। বুক ও পেট সাদা। তার ওপর চওড়া কালো দুটি দাগ। ডানার প্রান্তের পালক ময়লা হলুদ। লেজ পাটকিলে কালো। তবে লেজের দুপাশের পালক সাদা। শরীরের তুলনায় লেজটা বড়। চোখ দুটো বেশ মায়াবী। চোখের ওপরে সাদা বাঁকানো টান। পা হালকা গোলাপি। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে প্রায় একই রকম। সব ধরনের খঞ্জনই দেখতে সুন্দর। সে তুলনায় বনখঞ্জন একটু নিষ্প্রভ। তবে চেহারাটা মায়াবী।

বনখঞ্জন হিংসুটে কিংবা ঝগড়াটে নয়। বিচরণ করে একাকী। এরা পরিযায়ী পাখি। শীত শুরু হওয়ার আগেই উপমহাদেশে চলে আসে। থেকে যায় গ্রীষ্মের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত। অন্যসব খঞ্জন সাধারণত মাঠ-প্রান্তরে বিচরণ করলেও এরা বনে জঙ্গলে বেশি বিচরণ করে। তুলনামূলকভাবে ফাঁকা জঙ্গল এদের পছন্দ। সাধারণত আমাদের দেশে প্রায় আট প্রজাতির খঞ্জন দেখা যায়। বনখঞ্জন, সাদা খঞ্জন, বড় পাকড়া খঞ্জন, পাকড়া খঞ্জন, ধূসর খঞ্জন, হলুদ খঞ্জন, হলদে মাথা খঞ্জন, কালো মাথা খঞ্জন। বড় পাকড়া খঞ্জন ছাড়া অন্যরা পরিযায়ী হয়ে আসে। কয়েক প্রজাতি এ দেশে ডিম বাচ্চাও ফোটায়। সব ধরনের খঞ্জনই চঞ্চল প্রকৃতির। স্থিরতা এদের মাঝে নেই বললেই চলে। নাচের ভঙ্গিতে লেজ দোলাতে থাকে সর্বক্ষণ। অবশ্য কোমরের গড়ন ভিন্নতার কারণে কোমরটা সারাক্ষণ কাঁপতে থাকে। ফলে মনে হয় এরা বুঝি সারাদিন নেচে বেড়ায়। প্রকৃতপক্ষে তা নয়।

সব ধরনের খঞ্জনের প্রিয় খাবার পোকামাকড়। বনখঞ্জনরাও তদ্রুপ বনপ্রান্তরে ঘুরে ঘুরে পোকামাকড় খেয়ে থাকে। প্রজনন সময় মে-জুলাই। বাসা বাঁধে ঘাসবনে অথবা গাছের গোড়ার খোঁদলে। উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করে শুকনো ঘাস, নরম লতাপতা। বাসার আকৃতি লম্বাটে। ডিমের সংখ্যা ২-৫টি। ডিম ফুটতে সময় নেয় ১৭-১৯ দিন।

লেখক: আলম শাইন। কথাসাহিত্যিক, কলামলেখক, বন্যপ্রাণী বিশারদ ও পরিবেশবিদ।
সূত্র: দৈনিক মানবকণ্ঠ, 12/10/2012

আরো পড়ুন