দুধরাজ | Asian paradise flycatcher | Terpsiphone paradisi

177

ছবি: ইন্টারনেট।

শুধু গাছগাছালি নয়, প্রকৃতির সব ধরনের সুন্দরের আবাসস্থলই সুন্দরবন। যারা এ বনে গেছেন, তাদের বিষয়টি বুঝিয়ে বলার দরকার নেই। তবে এটুকু বলতে হয়, একবার এ বনে গেলে বারবার যেতে ইচ্ছা করে যে কারোরই। এমনই অহঙ্কারী রূপ সুন্দরবনের। গিয়েছি সুপতির (শরণখোলা রেঞ্জ) জঙ্গলে। রেঞ্জ অফিসে প্রবেশ করে আমাদের আগমনের উদ্দেশ্য জানিয়েছি ডেপুটি রেঞ্জারকে। তিনি আপ্যায়ন করে বনের ভেতরে ঢোকার সুযোগ করে দিলেন। নদীর তীর ধরে হাঁটছি। কিছু অচেনা পাখি নজরে পড়তেই ক্যামেরাবন্দি করে নিয়েছি। এরই মধ্যে দেখতে পেয়েছি উঁচু গাছের ডালে বসে রয়েছে একটি ধবধবে সাদা পাখি। দেখে হাঁ করে তাকিয়ে রয়েছি। এ কী দেখছি! পাখি তো! দুধসাদা রঙের এ পাখি আগে কখনও দেখিনি। নাম শুনেছি। এবার নিজ চোখে দেখেছি। এ পাখির রূপের বর্ণনা দেওয়ার সাধ্য নেই। সংক্ষেপে শুধু এটুকুই বলব, আমাদের দেশের পাখিবিশারদরা এদের ‘স্বর্গীয় পাখি’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

পাখিটার বাংলা নাম: ‘দুধরাজ’। অঞ্চলভেদে সুলতান বুলবুল, হোসনি বুলবুল, নন্দনপাখি ইত্যাদি নামে পরিচিত। ইংরেজি নাম: ‘এশিয়ান প্যারাডাইস ফ্লাইক্যাচার’ (Asian paradise flycatcher), বৈজ্ঞানিক নাম: ‘টেপসিফোন প্যারাডিসি’ (Terpsiphone paradisi)।

পাখিটি বেশ লম্বা। লেজ ছাড়া ১৯-২২ সেন্টিমিটার। লেজসহ প্রায় ৩৩ সেন্টিমিটার লম্বা। শরীরের গড়ন চিকন। মাথায় কালো রঙের ঝুঁটি। ঝুঁটির চুলগুলো পালিশ করা কালো। কপালও কালো। ঠোঁট নীলচে, সামান্য বাঁকানো। গলা, বুক কালো। চোখের মণি নীল। পায়ের রঙ হালকা লালচে। পিঠের পালক অধিকাংশই ধবধবে রূপালি সাদা। ডানা ও লেজের পালক সাদা। কয়েকটা পালকে সাদার মাঝখানে কালো লম্বা লাইন। লম্বা লেজটি দুই পালক বিশিষ্ট। চুলের ফিতার মতো। এ হচ্ছে পুরুষ দুধরাজের শারীরিক বর্ণণা। অপরদিকে সম্পূর্ণ বিপরীত চেহারা স্ত্রী দুধরাজের। ওদের লম্বা লেজ থাকে না। দেখতে সুশ্রীও নয়। মাথায় ঝুঁটি রয়েছে ঠিকই তবে পুরুষের মতো আহামরি রূপ নেই। পিঠের রঙ হালকা বাদামি, পেটে ধুসরের সঙ্গে সাদার মিশ্রণ। পাখিবিশারদ ছাড়া অন্য যে কেউ প্রথম দেখলে দুটিকে দুই প্রজাতির বলে ভুল করবেন। কণ্ঠস্বর কর্কশ। ভয় পেলে ‘কই কোঁ..কি.. ই..ই..ই..ক্যাঁচ..’ শব্দে চেঁচিয়ে ওঠে। প্রজনন মৌসুমে মোলায়েম সুরে ডাকাডাকি করে। এরা পাঁচ ধরনের সুরে ডাকতে পারে। কোনোটিই শ্রুতিমধুর নয়। স্বভাবে চঞ্চল। সুন্দরবনের বনমোরগ ওদের বন্ধু। সর্বদাই বনমোরগ-মুরগীর সঙ্গে ওঠবস করে। কারণ বনমোরগ ওদের শক্ত ঠোঁট দিয়ে মাটি খুঁচিয়ে খাবার সংগ্রহ করার সময় পোকামাকড় উঠে এলে তা খায় দুধরাজ। অপরদিকে বনমোরগেরও স্বার্থ আছে দুধরাজকে কাছে রেখে। সাপ-বেজি, বনবিড়াল ইত্যাদি নজরে এলে সঙ্গে সঙ্গে কর্কশ শব্দ করে বন্ধুকে জানিয়ে দেয়। দুধরাজ শুধু সুন্দরবনে নয়, লোকালয়েও বাস করে। তবে একেবারেই কম।

দুধরাজের প্রিয় খাবার কীটপতঙ্গ। প্রজনন সময় ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই। গাছের সর্বোচ্চ ডালে ঘাস, লতাপাতা, মাকড়সার জাল দিয়ে পেয়ালা আকৃতির বাসা বানায়। ডিম পাড়ে ৩-৫টি। ডিম ফোটে ১৮-২০ দিনে। সব ডিম ফোটে না, সব শাবক বাঁচেও না। বি.দ্র :বন্যপ্রাণী শিকারিদের প্রতিহত করুন।

লেখক: আলম শাইন। কথাসাহিত্যিক, কলাম লেখক, বন্যপ্রাণী বিশারদ ও পরিবেশবিদ।
সূত্র: দৈনিক সমকাল, 29/09/2012

আরো পড়ুন