কোকিল | Asian Cuckoo | Eudynamys scolopaceus

973

ছবি: ইন্টারনেট।

কোকিল ছানাটা বন্দি হয়েছে এক দুষ্ট বালকের হাতে। ছানাটাকে উদ্ধার করতে কিছুটা বেগ পেতে হয়েছে বৈকি। প্রথমে ভয় লাগিয়েছি। কাজে দেয়নি। পরে কিছু টাকা ওর হাতে ধরিয়ে দিয়ে ছানাটাকে ছিনিয়ে এনেছি। আহত কোকিল ছানাটাকে নিয়ে বড্ড বিপাকে পড়েছি সেই দিন। ওর পা থেকে রক্ত ঝরছে। খাচ্ছে না কিছুই। বাধ্য হয়ে পাখি বিশেষজ্ঞ শরীফ খানের দ্বারস্থ হলাম। তিনি জানালেন, জাম, ডুমুর, আঙ্গুর ফল থেঁতলে খাওয়াতে। এরই মধ্যে পায়ে মলম লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিয়েছি। বাজারে গিয়ে জাম নিয়ে এসেছি। ফলগুলো থেঁতলে ওর মুখে তুলে দিয়েছি, কিছুটা খেলেও বাকিটা উগরে ফেলেছে। দিন-রাত অবধি খাবার না খেয়ে শাবক কাহিল হয়ে গেছে। সকালের দিকে প্রচণ্ড চেঁচামেচি আরম্ভ করে দিয়েছে। ওর আকুতিতে গিন্নি পেরেশান হয়ে গেলেন। তার হাতে ছিল মাখানো আটার মণ্ড। ছোট্ট এক টুকরো মুখের কাছে ধরলেন গিন্নি। অমনি গপ করে গিলে নিল ছানাটা। সে থেকে ওকে দিন দশেক রুটির টুকরো আর ভাত থেঁতলে খাইয়েছি। পাখিটা পুরোপুরি সুস্থ হতেই ওকে মুক্ত করে দিয়েছি। কিন্তু সে পালিয়ে যায়নি বরং খাঁচায় ঢুকে পড়েছে। তারপরও ওকে জোর করে উড়িয়ে দেয়ার চেষ্টায় ব্যর্থ হয়েছি।
আদতেই এ পাখি এতটা ভদ্র নয়। বড়রা মোটামুটি ধাড়িবাজ। ধূর্ত কাকের চোখ ফাঁকি দিয়ে ওদের বাসায় ডিম পেড়ে নিজের বংশ বৃদ্ধি ঘটায়। ‘সুসময়ের বন্ধু’ পাখি নামে পরিচিত, বলা হয় বসন্তের দূতও। বসন্তকালে লোকালয়ে চলে আসে ওরা। পুরুষ পাখি ‘কুহু-কুহু-কুহু’ ডেকে মানুষের মন মাতিয়ে তোলে। সুরে এক ধরনের মাদকতা রয়েছে। স্ত্রী পাখির কণ্ঠ তত সুরেলা নয়। কর্কশ। ডাকে ‘খিক্-খিক্-খিক্’ স্বরে। বৃক্ষচারী পাখি এরা। পারতপক্ষে ভূমি স্পর্শ করে না। হাঁটে লাফিয়ে লাফিয়ে। গায়ে পড়ে কারো সঙ্গে বিবাদ বাধায় না।

এ পাখির বাংলা নাম: ‘কোকিল বা কুলি’| ইংরেজি নাম: ‘এশিয়ান কুক্কু’ (Asian Cuckoo)| বৈজ্ঞানিক নাম: (Eudynamys scolopaceus), গোত্রের নাম: ‘কুকুলিদি’।

এরা লম্বায় ৩৯-৪৬ সেন্টিমিটার। পুরুষ পাখির বর্ণ কুচকুচে কালো হলেও উজ্জ্বল সবুজের আভা বের হয় শরীর থেকে। চোখের তারা টকটকে লাল (কাক-কোকিলের মধ্যে বড় তফাত এটি)। স্ত্রী পাখির বর্ণ কালোর ওপর বাদামি ফোঁটাযুক্ত। সমস্ত পিঠে অসংখ্য বাদামি ফোঁটা। এদের নিচের দিকটা সাদাটে বর্ণের ওপর বাদামি ফোঁটা। লেজের ওপর সাদা ফোঁটার সঙ্গে স্পষ্ট ডোরাদাগ। উভয় পাখির ঠোঁট নীলচে-সবুজ এবং পা পায়ের পাতা কালচে।

কোকিলের প্রিয় খাবার ফল-ফলাদি। ফুলের মধু, খেজুরের রস এবং কীটপতঙ্গেও ভাগ বসায়। প্রজনন সময় মে থেকে জুন। নিজেরা বাসা বাঁধতে জানে না বিধায় পরের বাসায় ডিম পাড়ে। বিশেষ করে কাক, সাতভায়লা পাখির বাসায় ডিম পাড়ে। ডিমের সংখ্যা ১-২টি।

লেখক: আলম শাইন। কথাসাহিত্যিক, কলাম লেখক, বন্যপ্রাণী বিশারদ ও পরিবেশবিদ।
সূত্র: মানবকণ্ঠ, 21/06/2013 | বাংলাদেশের খবর, 07/03/2018

আরো পড়ুন