সবুজ টিয়া | Rose ringed parakeet | Psittacula krameri

1844

ছবি: ইন্টারনেট।

ছোটবেলায় একবার একটা টিয়া আমার ডান হাতের তর্জনির মাথাটা কামড়ে বোঁচা বানিয়ে দিয়েছে। আঙুলের মাথাটার দিকে নজর পড়লে সে স্মৃতি মনে পড়ে আজও। নানাবাড়ির একটা নারিকেল গাছের ফোকরে টিয়া দম্পতির আনাগোনা লক্ষ্য করেছি ক’দিন ধরে। গাছটার পাশেই ছিল হেলেপড়া হিজল গাছ। গাছটা বেয়ে উপরে উঠে আবিষ্কার করলাম ওদের ঘরে শাবক এসেছে। শাবক বড়ও হয়েছে ক’দিনের মধ্যে। সেই সুযোগের প্রতীক্ষায় ছিলাম আমি। চুপিচুপি হিজলের মাথায় চড়ে নারিকেল গাছের ফোকরে হাত ঢুকালাম। তখনো জানতে পারিনি আমার জন্য একটা ভয়ঙ্কর বিপদ অপেক্ষা করছে। হাতটা ঢুকানোর সঙ্গে সঙ্গে তজর্নির মাথায় কামড় বসিয়ে দিয়েছে পাখিটা। ভয়ে চেঁচিয়ে হাত টেনে বের করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু সহজে বের করতে পারিনি। কিছুক্ষণ টানাটানি করে অবশেষে টিয়ার মাথাশুদ্ধ বের করে আনলাম।

তখনো বেচারি আঙুলে কামড়ে ধরে ঝুলে আছে। রক্তাক্ত আঙুলের ছিরি দেখেও পাখিটাকে পাকড়াতেই ব্যস্ত ছিলাম। এক পর্যায়ে ওকে গ্রেফতার করে বাচ্চাসহ ঘরে নিয়ে এলাম। খাঁচায় ঢুকাতেই পাখিটা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে নিজের বাচ্চার গলায় কামড় বসিয়ে দু’ভাগ করে ফেলল। পাখিটার হিংস তা দেখে ভয় পেয়ে ওকে ছেড়ে দিলাম দ্রুত। সম্প্রতি ঘটেছে বিপরীতটি। অসুস্থ একটা টিয়াকে সুস্থ করে ছেড়ে দিলাম কিন্তুু বোকাটা যায়নি, ঘরে ফিরে এসেছে। এক পর্যায়ে অনধিকার চর্চাও আরম্ভ করে দিল। ঘরের কাগজপত্র ধারালো ঠোঁট দিয়ে কেটে কুটিকুটি করতে লাগল। খেতে বসলে রীতিমতো রুটি নিয়ে টানাটানি আরম্ভ করে দিত। মেয়ের মাথায় বসে চুল নিয়ে টানাটানি করতো। ছেলের কাঁধে বসে ওর কান কামড়ে আদর করে দিতো। এত কাছাকাছি আসার পরও পাখিটাকে বিদায় করে দিয়েছি। কারণ ওর জন্য ফ্যানের সুইচ অন করা যেত না। দুর্ঘটনায় পড়ার সম্ভাবনা ছিল।এ পাখি হিংস হলেও বেশ মিশুক। দোষগুণ দু’টিই এদের মাঝে বিদ্যমান। পোষ মানে দ্রুত, শিখালে কথাও বলে। অজস ছড়া-কবিতা রচিত হয়েছে এদের নিয়ে। দেশের প্রায় প্রতিটি স্থানেই কমবেশি এদের সাক্ষাৎ মিলে। বেশি দেখা যায় আর্দ্র পাতাঝরা বনে। পাহাড়ি বনবনানীতেও প্রচুর দেখা যায়। দেখা যায় বসতঘরের আশপাশে এবং শহরেও দেখা মেলে।

এদের বাংলা নাম: ‘সবুজ টিয়া’, ইংরেজি নাম: ‘রোজ রিংগডপ্যারাকিট’ (Rose-ringed parakeet), বৈজ্ঞানিক নাম: ‘সিট্টাক্যুলা ক্রামেরি’(Psittacula krameri), গোত্রের নাম: ‘সিট্টাসিদি’।

লম্বায় ৪০ সেন্টিমিটার। দেহের তুলনায় লেজ লম্বা। ঠোঁট রক্ত লাল, শক্ত-মজবুত ও ধারালো। উপরের ঠোঁট বড়শির মতো বাঁকানো। জিভ শক্ত। চোখের বলয় কমলা রঙের, মনি হলুদ-সাদা। দেহের অধিকাংশ পালক কলাপাতা-সবুজ। পিঠের কিছু অংশ ফিকে নীলচে, ধূসর আভাযুক্ত ও হলুদ। স্ত্রী-পুরুষ পাখি দেখতে একই রকম মনে হলেও পার্থক্য আছে খানিকটা। পুরুষ পাখির থুতনির নিচে কালো দাগ, গলায় ও ঘাড়ে গোলাপি-কালো মিশ্রণ কণ্ঠী। স্ত্রী পাখির ঘাড়ে সবুজ পালকে আবৃত। এ ছাড়াও পুরুষ পাখি কিছুটা লম্বা।

প্রধান খাবার ফল, গাছের কচিপাতা, শস্যবীজ। ধান, বাদাম, দুধভাত বেশ প্রিয়। প্রজনন সময় মার্চ-মে। বাসা বাঁধে গাছের কোটরে অথবা পুরাতন দরদালানের ফাটলে। ডিম পাড়ে ৩-৪টি। ডিম ফোটে ২২-২৪ দিনে।

লেখক: আলম শাইন। কথাসাহিত্যিক, কলামলেখক, বন্যপ্রাণী বিশারদ ও পরিবেশবিদ।
সূত্র: দৈনিক মানবকণ্ঠ, 18/05/2013

আরো পড়ুন